প্রকাশক পরিচিতি

শৈশব থেকেই আত্মকর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ভাবতেন, এমন কোনো ধরনের উদ্যোগ নেবেন, যার মধ্য দিয়ে বহু মানুষের প্রত্যক্ষ কল্যাণও করা যায়। তার মনে হয়েছে, এক্ষেত্রে বইয়ের ব্যবসা হতে পারে স্বপ্নপূরণের পথ।
তাই স্নাতক ডিগ্রি লাভের কিছুদিন পর এক আত্মীয়ের প্রেরণায় রাজধানী ঢাকার শিক্ষা প্রাণকেন্দ্র নীলক্ষেতে প্রতিষ্ঠা করলেন প্রথম প্রতিষ্ঠান বর্ণালী বইঘর। সেখানে পাঠক ও লেখকদের প্রত্যক্ষভাবে জানা এবং পরস্পরের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা বোঝার সুযোগ পেলেন। অনেক লেখক ও অধ্যাপকদের সঙ্গে গড়ে উঠল নিবিড় সখ্য। সেই থেকেই শিক্ষাবিদদের সঙ্গে নিয়ে নতুন ধরনের কিছু প্রকাশনা করার ভাবনা। অন্যদিকে শিক্ষার জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক বাবার আদর্শও নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
এভাবেই আজকের জনপ্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রফেসর’স প্রকাশন-এর স্বপ্নের বীজ বোনা। আর ধীরে ধীরে দেশের নতুন ধারার প্রকাশনার স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠা। তার নিরলস পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রকাশক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সুশিক্ষিত, কর্মমুখর ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনে চলেছেন।
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ১৯৬৯ সালের ১ জুন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাতাবুনিয়া গ্রামের এক সুশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা স্থানীয় সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক মরহুম আবদুর রহিম, মা মিসেস হালিমা খাতুন। ২০০০ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দুই কন্যাসন্তানের জনক।
১৯৯০ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ১৯৯২ সালে বর্ণালী বইঘর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্বাধীন পেশা শুরু করেন। কিন্তু কর্মোদ্যমী ও সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি দেখতে পান, কেবল বইয়ের ব্যবসার মাধ্যমে তিনি স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন না। তাকে আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে হবে। সে সময় একদল অধ্যাপক বন্ধুর প্রেরণায় ১৯৯৪ সালে শুরু করেন ভিন্নধর্মী প্রকাশনা ব্যবসা। এবং অধ্যাপক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রতিষ্ঠানের নাম দেন প্রফেসর’স প্রকাশন। শুরুর দিকে টিকে থাকার প্রয়োজনে প্রচলিত একাডেমিক কিছু বই প্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন তিনি।
জনাব জসিম উদ্দিন মনে করলেন, তিনি এমন ধরনের প্রকাশনায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন, যার মধ্য দিয়ে দেশে সাধারণ জ্ঞান চর্চা, কর্মসহায়ক শিক্ষা এবং বিভিন্ন উন্নত পেশার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা সফল হতে পারেন। এর প্রথম ধাপ হিসেবে ১৯৯৬ সালে শুরু করলেন দেশের প্রথম সাধারণ জ্ঞান, তথ্য এবং শিক্ষা ও পেশার গাইডলাইন ভিত্তিক মাসিক পত্রিকা প্রফেসর’স কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স। এর পথ ধরে পরবর্তীতে বাজারে আরো বহু ধরনের পত্রিকা প্রকাশিত হলেও মান, সঠিকতা ও প্রয়োজন পূরণে এটির অবস্থান শীর্ষে। এবং প্রচার সংখ্যা প্রতি মাসে তিন লাখেরও বেশি।
এভাবে প্রফেসর’স প্রকাশন নানামুখী উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে আছে জব সেক্টর প্রিপারেশনের বহু ধরনের প্রকাশনা─ বিসিএস সহায়ক বই থেকে শুরু করে ব্যাংকার্সসহ বিভিন্ন প্রথম শ্রেণীর উচ্চস্তরের কর্মসংস্থানের সাহায্যকারী বই, প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ, ইংরেজি-বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষা সহায়ক বই এবং সাধারণ জ্ঞান সিরিজ।
প্রফেসর’স-এর আরেকটি দূরদর্শী উদ্যোগ English Learning & Practice Series। তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হিসেবে ইংরেজির গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। কিন্তু এটি শেখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই খুব সহজে ইংরেজি লেখা ও শেখার জন্য স্বল্পমূল্যে এই সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতি বছর এই সিরিজের দুটি করে বই প্রকাশিত হচ্ছে।
আনন্দের বিষয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রফেসর’স প্রকাশন-এর এই সব বইয়ের সহযোগিতায় দেশের হাজার হাজার সুশিক্ষিত মানুষ নিজেদের নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর পেশাই বেশি এবং এই সহযোগিতার কথা অনেকে সানন্দেই স্বীকার করেন।
তবে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে জনাব জসিম এখানেই স্থির রইলেন না। নিত্যনতুন বই প্রকাশের পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করে চলেছেন নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমনস্ক জাতি গঠনের স্বপ্নে ২০০১ সাল থেকে অলাভজনকভাবে প্রকাশ করে চলেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা সায়েন্স ওয়ার্ল্ড।
দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সৃজনশীলতার বিস্তারে ২০০২ সাল থেকে শুরু করেছেন সৃজনশীল প্রকাশনা কথাপ্রকাশ। দেশবরেণ্য লেখকদের বিচিত্র বই নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ও পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকাশনা।
প্রকাশনায় নিজস্বতা রক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজস্ব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান সুবর্ণ প্রিন্টার্স।
শিশুদের মেধা বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ২০০৮ সাল থেকে শুরু করেছেন শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশনা শৈশব পাবলিকেশন্স এবং কুসংস্কারমুক্ত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে ২০১১ সাল থেকে শুরু হয়েছে আকীক পাবলিকেশন্স-এর যাত্রা।
কেবল ব্যবসা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শিক্ষার বিস্তার ও সমাজের কল্যাণের জন্যও সেবামূলক কাজ করে চলেছেন তিনি। বেশ ক বছর ধরে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেবা কার্যক্রম চালালেও ২০১০ সালে প্রাণপ্রিয় পিতা-মাতার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন হালিমা-রহিম ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রফেসর’স প্রকাশন-এর অর্থায়নে বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাসামগ্রীসহ খাতা বিতরণ; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সৃজনশীল জ্ঞানবিস্তারে পাঠাগার স্থাপন।
দেশের বেকারত্ব দূর করার উদ্যোগ হিসেবে তিনি নানারকম উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিসিএস, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন পরীক্ষার আগে চূড়ান্ত পরীক্ষাপূর্ব পরীক্ষা। ২০০৮ সালের মার্চে প্রাথমিক শিক্ষক মূল্যায়ন পরীক্ষা ছিল এর অন্যতম, যা খুব প্রশংসিত হয়েছিল।
প্রফেসর’স প্রকাশন-এর একটি বিশেষ উদ্যোগ সাধারণ জ্ঞানের বই নতুন বিশ্ব। এটি একটি কল্যাণমূলক প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য হলো─ দেশের সবার জন্য সব ঘরে সাধারণ জ্ঞানের প্রসার ঘটানো ও বিশ্বের নতুন নতুন তথ্যের সাথে সংযোগ সৃষ্টি এবং এই বইয়ের সম্পূর্ণ লভ্যাংশ জ্ঞানের বিস্তারে ব্যয় করা। এর অর্থায়নে ২০১০ সাল থেকে যাত্রা শুরু করেছে দেশব্যাপী সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা হিরো অব দ্য নলেজ, যা দেশজুড়ে বেশ সাড়া ফেলেছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের আরো অনেক সৃষ্টিশীল ও কার্যকর আয়োজনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। এছাড়া তরুণদের বাস্তবানুগ ও কার্যকর শিক্ষা বিস্তারেও তিনি আরো ভূমিকা রাখতে চান।
জনাব জসিম তার প্রকাশনা শিল্পকে মানবকল্যাণের পথে একটি জরুরি কাজ বলে মনে করেন। কারণ একটি সচেতন ও সুপরিকল্পিত প্রকাশনার মাধ্যমে অনেকটাই বাস্তবায়িত হতে পারে সুশিক্ষিত, কর্মক্ষম ও আত্মসচেতন জাতি। তিনি মনে করেন, সময়কে যথাযথ মূল্য দিতে পারলেই জীবনকে সমৃদ্ধ করা যায়। তার যেটুকু সাফল্য তার মূলে আছে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা।
সদালাপি, বিনয়ী ও পরোপকারী জনাব মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা নিয়ে ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরো বৃহৎ কিছু করার স্বপ্ন দেখেন।

Bengali Bengali English English French French German German Spanish Spanish
Scroll Up